মঙ্গলবার, জুন ২৭, ২০১৭
হোম > সফল কাহিনী > এক সময় সাংবাদিকতায় নারীরাই আধিপত্য বিস্তার করবে : তাসমিমা হোসেন

এক সময় সাংবাদিকতায় নারীরাই আধিপত্য বিস্তার করবে : তাসমিমা হোসেন

তাসমিমা হোসেন একজন সফল সম্পাদক এবং উদ্যোক্তা। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে তিনি বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত নারী বিষয়ক ম্যাগাজিন পাক্ষিক অনন্যা অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে সম্পাদনা ও প্রকাশ করে যাচ্ছেন। একজন মালিক সম্পাদক হয়ে এই ম্যাগাজিনের উন্নয়নের জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আসলে পাক্ষিক অনন্যা শুধু নারী সাংবাদিক নয়, পুরুষ সাংবাদিক তৈরির ক্ষেত্রেও পুরোপুরি ভূমিকা রাখছে এবং আজো রেখে যাচ্ছে। তাসমিমা হোসেন সম্প্রতি দেশের অন্যতম প্রাচীন ও অভিজাত বাংলা দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। নারী সাংবাদিকদের জন্য এ অনুপ্রেরণা সত্যিই নারীর সফলতার কাহিনী। আমাদের কন্যা সাহসিনী তার জীবনের অভিজ্ঞতা ও অর্জনের বিষয়গুলো জানতে একটি সাক্ষাতকার নিয়েছে। এখানে তা তুলে ধরা হল –

কন্যা সাহসিনী : আপনি কীভাবে সাংবাদিকতা পেশায় এলেন? কে বা কারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?
তাসমিমা হোসেন: সত্যি কথা বলতে কি, আমি খুব একটা পরিকল্পিতভাবে এ পেশায় আসিনি এবং আমি সেই অর্থে সাংবাদিকতা পেশাকেও গ্রহণ করিনি। আমি বলতে চাচ্ছি, I was not trained to be a journalist। যেহেতু বৈবাহিকসূত্রে আমি বাংলাদেশের একটি বৃহত্তম গণমাধ্যম পরিবারের (দৈনিক ইত্তেফাক) সঙ্গে জড়িত, সেই  সূত্রে আমি নিজের মতো করে নারীদের জন্য একটি সময়োপযোগী নারী তথা পারিবারিক পত্রিকা বের করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছি। তা থেকেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে এই পেশায় এসেছি এবং গত ২৬ বছর ধরে আমি এই ম্যাগাজিনটির সম্পাদক-প্রকাশক হিসেবে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতাই আমার আজকের অবস্থান। আমি নিজেকে একজন সাংবাদিক ছাড়াও এই পেশার একজন ব্যবস্থাপক হিসেবেও নিজেকে দেখতে চাই।

ক:সা: এরপরও বলা যায় আপনি সাংবাদিকতায় যুক্ত আছেন। এক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন কী? যদি হয়ে থাকেন তা কীভাবে দূর করতে পেরেছেন?
তা:হোসেন: আমি উদ্যোক্তা হিসেবে এই পেশায় দক্ষ লোকের অভাব বোধ করেছি ভীষণভাবে। প্রকাশনা হাউস যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সেই হারে দক্ষ জনবল গড়ে ওঠেনি। প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলার মতো প্রতিষ্ঠানের অভাব আছে বলেই আমার এমনটি মনে হয়।

ক:সা: আপনি যখন অনন্যা প্রকাশ শুরু করেন তখন নারী সাংবাদিকদের অবস্থা কেমন ছিল?
তা: হোসেন: ১৯৮৮-তে অনন্যা যাত্রা শুরু করে। তখন নারীদের কাছে সাংবাদিকতা অচেনা একটা পেশা। সামাজিকভাবে এই পেশায় নারীদের নিরুতসাহিত করা হত। আমার জানা মতে, সে সময় কয়েকজন নারী সাংবাদিকতা করতেন। মানে প্রতিটি সংবাদপত্রে ২-৩ শতাংশ নারী সাংবাদিক ছিলেন। ইত্তেফাকের মতো বিশাল পত্রিকাতেও মাত্র ২-৩ জন নারী সাংবাদিক ছিলেন। সব মিলিয়ে সেটা ছিল নারীদের জন্যে এই পেশার একটা সূচনাকাল।

ক:সা: আপনি একজন সফল সম্পাদকও বটে, সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে আপনি কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?
তা: হোসেন: আমি একজন on Job trained person, ঠেকে ঠেকে শিখেছি। আমি সবার কাছ থেকে দেখে দেখে শিখেছি। আমার মনে হয়, আমার মধ্যে একজন ইনবর্ন ব্যবস্থাপক আছে। I can mange things very well। তাই সমস্যাকে আমি কখনও সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে তার একটা বিকল্প পন্থা বা সমাধান বের করার পেছনে সময় দিয়েছি বা এখনো দিয়ে থাকি। এই আর কি।

ক:সা: বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের সংখ্যা অনেক কম, এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
তা:হোসেন: আমার মনে হয় নারীদের সেই অর্থে সুযোগ দেওয়া হয় না। আবার এও ঠিক, এই পেশায় সুযোগ নেওয়ার মতো নারীদের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম। নারীর ক্ষমতায়ন সবদিক থেকে যেভাবে হচ্ছে, আশা করছি, খুব দ্রুত এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।

ক:সা: আপনি একটি নারী ম্যাগাজিন এবং একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কোন দায়িত্বটি আপনার কাছে কঠিন মনে হয়?
তা: হোসেন: অবশ্যই দৈনিকের দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি। এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। অনন্যা পাক্ষিক। এটি প্রকাশিত হয় মাসে দু’বার, আর ইত্তেফাক মাসে ৩০ বার। আকাশ-পাতাল তফাত। তবে অনন্যার অভিজ্ঞতার মূল্য আমার কাছে বিশাল। ২৬ বছর মুখের কথা নয়। অন্তত আত্মবিশ্বাসের জন্য তো বটেই।

ক:সা: সাংবাদিকতায় নীতি নির্ধারণের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে নারী সাংবাদিকদের কর্মসংস্থান এবং যোগ্যতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আপনার আরো ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
তা:হোসেন:  ইচ্ছে হয় অনেক কিছু করি। কিন্তু সেই সময় আর কোথায়? বয়স তো আর কম হল না। তবু মনে হয় ভালো একটা ট্রেনিং ইন্স্টিটিউট করা খুবই দরকার। এক্সপোজারের বড় বেশি অভাব আমাদের দেশে। আমাদের মেয়েদের মেরিট এবং পোটেনশিয়ালিটি আছে। কিন্তু এক্সপোজার করবার ক্ষেত্র এবং ক্রমাগত প্রশিক্ষণের বড় অভাব।

ক:সা: সম্পাদক হিসেবে সংবাদপত্র সম্পর্কিত বিভিন্ন কমিটির সাথে আপনার সম্পৃক্ত থাকার কথা। সেখানে অন্যান্য পুরুষ সম্পাদকদের থেকে আপনি কী ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন?
তা:হোসেন: ইন জেনারেল, পুরুষ সম্পাদকরা যথেষ্ট সহযোগিতা করতে চান। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি দেখেছি পুরুষদের ইগো সমস্যার জন্য তারা সাধারণত নারীদের সহযোগিতা করার ভাব দেখান বটে, কিন্ত অনেক সময় তারা নারীদের উপেক্ষা করে চলেন। মানে তারা নারীদের দমিয়ে রাখতে চান। এটা ওদের সমস্যা, আমার নয়। আমি নিজের মত ও দক্ষতা প্রকাশ করতে কখনো পিছিয়ে থাকার পক্ষপাতী নই।

ক:সা: বর্তমান অবস্থায় পৌঁছানোর পিছনে আপনার কী গুণ বা কাজ সহায়ক হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
তা:হোসেন: পূর্বেই বলেছি, ব্যবস্থাপনার গুণটি আমার সহজাত। আরও কিছু বিষয় আছে হয়ত, সেগুলো বলে আমি আমার অবস্থান, পারিপাশির্কতা এবং ভাগ্যের ভূমিকাকে খাটো করে দেখতে চাই না।

ক:সা: বর্তমান প্রজন্মের নারী সাংবাদিকদের প্রতি আপনার উপদেশ এবং পরামর্শ কী?
তা:হোসেন: সাংবাদিকতা অন্য সব পেশা থেকে আলাদা। ভালো এবং দক্ষ সাংবাদিক হতে হলে একজনকে এ পেশার প্রতি অনেক বেশি Passionate হতে হবে। এটাকে শুধু পেশা হিসেবে দেখলে হবে না। নেশা হিসেবেও দেখতে হবে। দৃষ্টি রাখতে হবে সবসময় খোলা। একটি বিষয়কে নানা দিক থেকে দেখতে হবে। গভীর থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে। এ বিষয়ে একটা আদর্শগত দর্শন থাকা প্রয়োজন। মোদ্দা কথা, It is a very Passionate & Creative Profession। তাই এটাকে সেভাবেই নিতে হবে। আর নারী হিসেবে চলার পথে কিছু জটিলতা আসবেই। সেগুলো কৌশল করে আত্মবিশ্বাসের সাথে মোকাবেলা করতে হবে। এই পেশায় ইদানিং প্রচুর মেয়ে আসছে। এখন তারা খুব বেশি সংখ্যালঘু সেটা আমি বলব না। এক সময় এ পেশায় নারীরাই আধিপত্য বিস্তার করবে বলে আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *