শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > কর্মক্ষেত্রে প্রতিকূলতা > ঐক্যই বেতন বৈষম্য দূর করতে পারে

ঐক্যই বেতন বৈষম্য দূর করতে পারে

একজন নারী সাংবাদিকের কথা বলছি যিনি  একটি জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রের সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর কাজ করার পর তিনি ঐ পদে কাজ করার সুযোগ পান। ঐ পত্রিকায় অনেক সংবাদ কর্মী সপ্তম বা অষ্টম ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন পেলেও তিনি কোন ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী বেতন পান না। একই সময়ে তিনি এবং তার একজন পুরুষ সহকর্মী ঐ সংবাদপত্রে যোগ দিলেও তার সহকর্মী দুইবার ইনক্রিমেন্ট পেলেও তিনি তা পাননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে বারবার সম্পাদককে তাগাদা দিলে তিনি নানা অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। অথচ আমার সহকর্মী সম্পাদককে প্রভাবিত করে দুইবার ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। সংবাদপত্রে বেতন বাড়ানো, ইনক্রিমেন্ট পাওয়া বা পদন্নোতি এখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। যা আমাদের নারীদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।”

তার বক্তব্য স্পষ্টই প্রমাণ করে লিঙ্গ বৈষম্য কোন পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত প্রিন্ট মিডিতেও লিঙ্গ বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। যদিও যে কোন বৈষম্য বা সমস্যার খবর আমরা পত্রিকার মাধ্যমেই জানতে পারি, কিন্তু তাদের নিজেদের সমস্যার কথা তেমনভাবে জানা যায় না। এ বিষয়ে নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি বলেন, “আমাদের দেশে ইট ভাঙা কিংবা মাটি কাটা নারী শ্রমিকদের মত নারী সাংবাদিকরাও বেতন বৈষম্যের শিকার। সত্যি কথা বলতে কি এ সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা নানা কারণে প্রতিবাদ করতে পারি না। তবে বিষয়গুলো নিয়ে সবার ভাবা দরকার। অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও এ ধরণের বৈষম্য নিয়ে পেশাগত আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন এগিয়ে আসলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে তাদের কাজ করা উচিৎ।”

তিনি আরও বলেন, “পারিপার্শ্বিক নানা কারণে নারী সাংবাদিকদের পক্ষে সম্পাদক বা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের ঘরে যাতায়ত কিংবা কারণে অকারণে তাদের সাথে গল্প করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। এজন্য নারী সাংবাদিকদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে তাদের বেতন বৃদ্ধিসহ উন্নতি করতে ভীষণ বেগ পেতে হয়।” প্রসঙ্গক্রমে আরেকজন নারী সহ সম্পাদকের কথা বলা যায়। তিনি একটি অনলাইন সংবাদ সংস্থায় কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে তিনি চাকুরী ছেড়ে দিয়েছেন। কেননা একই পদে থেকে তার সহকর্মী তার চেয়ে বেশি বেতন পেতেন। বিষয়টি তিনি কর্তৃপক্ষকে বারবার বলার পর তার বেতন এমনভাবে বৃদ্ধি করা হয় যা তার সেই সহকর্মীর বেতনের সমপর্যায়ে যায়না।

তিনি আরো বলেন, “শুধু তাই নয়, নারী হিসেবে আমি আরও কিছু সমস্যা অনুভব করায় শেষ পর্যন্ত চাকুরী ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। শুধু সম্পাদক বা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক নয়, তাদের মন মানসিকতাও মিডিয়া হাউসে নারী সাংবাদিকদের বেতন বৈষম্যের অন্যতম কারণ।” এছাড়াও দেখা যায় যে, মিডিয়া হাউজগুলোতে নারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশ হিসেবে কর্তৃপক্ষ তাদের যতটা পছন্দ করেন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নারীদের ততটা গুরুত্ব দেন না। কেননা, অভিজ্ঞদের ভালো বেতন দিতে হবে। তারা ওয়েজ বোর্ড দাবি করবেন ইত্যাদি। অথচ শিক্ষানবিশরা বেতন নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করবেন না। কম বেতনে তাদেরকে চালিয়ে নেওয়া যাবে। তাই একই হাউজে কোন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নারী সংবাদকর্মী থাকলেও তাদেরকে ছাঁটাই করে তারা শিক্ষানবিশ খোঁজেন।

এসবের কারণ কি? এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (বিএফইউজে)-এর মহাসচিব ও ডেইলি স্টারের হেড অব মনিটরিং সেল-এর আব্দুল জলিল ভুঁইয়া বলেন, “হাতে গোনা দুই চারটি হাউজ ছাড়া বেশিরভাগ হাউজে নারীদের জন্য তেমন ভালো সুযোগ সুবিধা নেই। তবে এটা খেয়াল করেছি, পুরুষ সাংবাদিকরা সবসময় লেট নাইট করেন। অনেক সময় তারা হাউজে বেশি সময় দেন এবং নারীরা সে তুলনায় কম সময় দেন বলে অনেক হাউজে একই পদে নারী পুরুষের বেতন বৈষম্য থাকে। কিন্তু এটা হওয়া উচিৎ নয়। আমাদের সংগঠনে একটি কথা আছে- ‘নারী বলে যেন কাউকে বঞ্চিত করা না হয়’। আসলে ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের জায়গা। এখানে নারীরা তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন। এ রকম হলে আমরা বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে চাই। ”

বাস্তবতা হল চাকুরী হারানোর ভয়ে এসব বিষয় নিয়ে নারীরা তেমন কোন প্রতিবাদ করেন না। ঢাকার বাইরে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে এ সমস্যা অনেক বেশি। চুয়াডাঙ্গার মরিয়ম শেলি একটী প্রভাবশালী টেলিভিশন এবং বর্তমানে বন্ধ একটি সংবাদপত্রের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তিনি পত্রিকাটির কাজ শুরুর পর প্রথম পাঁচ মাসের বেতন পান। কিন্তু এরপরে তার বাইশ মাসের বেতন তিনি পাননি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমি বাইশ মাসের বেতন না পেলেও আমার কিছু পুরুষ সহকর্মী ঐ সময় বেতন পেয়েছেন।”

তিনি বলেন, “বেতন বৈষম্য দূর করতে সাংবাদিক নেতাদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। ওয়েজবোর্ডসহ প্রেস কাউন্সিলেও এ বিষয়ে একটি ধারা থাকা উচিৎ। কোন প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি বৈষম্য কিংবা হয়রানি হলে ঐ ধারায় সাজা থাকার বিধান রাখা যেতে পারে। এছাড়া নারী সাংবাদিকদেরও আরও সোচ্চার হতে হবে। তাদের মধ্যে ঐক্য থাকতে হবে। এ ধরণের বিষয়গুলোর প্রতিবাদ ও প্রতিকার আমাদেরই করতে হবে। তাহলেই বেতন বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *