শুক্রবার, আগস্ট ১৮, ২০১৭
হোম > সফল কাহিনী > গণমাধ্যমে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি

গণমাধ্যমে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি

রোবায়েত ফেরদৌস, সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। বিভিন্ন জার্নাল ও পত্রিকায় নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। ২০টির ও অধিক গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, গণমাধ্যম/শ্রেণীমাধ্যম, তথ্যের অধিকার, তছলিমার ক পান্ডলিপি পোড়ে না, ব্যবসায় সাংবাদিকতা, বাংলাদেশের সংবাদপত্রে জেন্ডার সংবেদনশীলতা, তথ্য অধিকারের স্বরূপ সন্ধানে, বিশেষজনের বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রভৃতি। তিনি গণমাধ্যম, নারী অধিকার, শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করে থাকেন দেশের প্রধান প্রধান দৈনিকগুলোতে। মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম অ্যাকটিভিস্ট; একই সাথে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে এ্যাংকর হিসেবে কাজ করছেন। সম্প্রতি নারী সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক নিয়ে কন্যা সাহসিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন রোবায়েত ফেরদৌস।

আর্টিকেল ১৯: আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৭ এর প্রতিপাদ্য ’ উইমেন ইন দ্য চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক’ আপনার দীর্ঘ সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতায় আলোকে গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের অবস্থান কেমন ?
রোবায়েত ফেরদৌস: আগের যে কোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় অনেক বেশি নারীরা সাংবাদিকতার পেশায় আসছে ও কাজ করছে। সংবাদ উপস্থাপনা, রিপোটিং ও সম্পাদনায় নারীদের সংখ্যা বাড়লেও সিদ্বান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় খুব বেশি নারী নেই। পুরুষরাই এখানে প্রধান। সম্পাদক, নিউজ এডিটর পদে নারীর সংখ্যা কম। নারী সাংবাদিকদের বিচরণের ক্ষেত্রটিতে ঢাকায় যতটা বেড়েছে মফস্বলে বা জেলা শহরগুলোতে ততটা বাড়েনি। হাজার বছরের পুরুষ তান্ত্রিক আধিপত্যের বাধাগুলো নারীরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পুরুষরা নারীদের ক্ষমতায়ীত করতে ভয় পায়।

আর্টিকেল ১৯: বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
রোবায়েত ফেরদৌস: আমাদের দেশের নারীরা বিশেষতঃ নারী সাংবাদিকরা এখনো কর্মস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পায় না। কর্মস্থলের নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা না থাকা, মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া, কর্মস্থলে ডে কেয়ার সেন্টার না থাকার কারণে নারীরা তথা নারী সাংবাদিকরা কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারছে না। ২০০৯ সালের ১৪ মে যৌন হয়রানী বিষয়ে হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা মুলক রায় প্রদান করে। যাতে বলা হয়, কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি হয়রানীমুলক আচরণ বন্ধ করতে, অভিযোগ গ্রহনের জন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করতে হবে। যার বেশিরভাগ সদস্য হবে নারী। দুএকটি প্রতিষ্ঠান বাদে কোন প্রতিষ্ঠানে তা মানা হয় না।অনেক সময় মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইলে নারী কর্মী ছাটাই করা হয়। যেটি সরাসরি আইনের লংঘন। অথচ শ্রম আইনে বলা হয়েছে, নারী কর্মীকে বেতনসহ চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হবে। নারীর কর্মপরিবেশ সংবেদনশীল নয়। নারীর কর্মস্থল কে নারী বান্ধব করতে হবে।

আর্টিকেল ১৯: সম্প্রতি নারী সাংবাদিক মেহেরুন রুনি হত্যাকান্ডর বিচারিক অগ্রগতি সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
রোবায়েত ফেরদৌস: গত ৪৬ বছরে অনেক সাংবাদিক মারা গেছে, অনেক সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হযেছে, মামলার শিকার হয়েছে। কিন্তু খুব একটা বিচার হয়নি। বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনো রয়ে গেছে। সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না বললেই চলে। মেহেরুন রুনি হত্যার পর তৎকালীন স্বরাষ্টমন্ত্রী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ৪৮ মাস পেরিয়ে গেলেও আমরা তার অগ্রগতি দেখতে পেলাম না।

আর্টিকেল ১৯: নারী বা নারী সাংবাদিক হওয়ার কারণে হত্যাকান্ড বা আক্রমনের শিকার নারীদের ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হয়? এ বিষয়ে আপনি কি মনে করেন?
রোবায়েত ফেরদৌস: হ্যা, কখনো কখনো নারী বা নারী সাংবাদিকদের নির্যাতনের ঘটনাকে আড়াল করার জন্য তার যৌনইতিহাস খুঁজে আনার প্রবণতা আমাদের সমাজে রয়ে গেছে। অথচ একজন পুরুষ নির্যাতন হলে তার যৌন ইতিহাস তুলে আনা হয় না। নারীদের ক্ষেত্রেই সেনশেসনাল নিউজ তৈরি করার একটা বাজে প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করি। যেমন সাগর-রুণি হত্যাকান্ডের পর রুনির কতগুলো প্রেমিক ছিল, তার ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল প্রভৃতি তুলে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। এমনকি তাদের শিশু সন্তানকে মিডিয়াতে তুলে আনা হয়, এটি সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার পরিপন্থি। সাংবাদিকরা কখনো কখনো সাংবাদিকতার নীতিমালা মানেন না।

আর্টিকেল ১৯: নারী সাংবাদিকদের জন্য স্বাধীন ও নিরাপদে কাজ করার ক্ষেত্রে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় ?
রোবায়েত ফেরদৌস: নারী সাংবাদিকদের জন্য স্বাধীন ও নিরাপদে কাজ করার ক্ষেত্র তৈরির জন্য অনেকগুলো কাজ আমাদের করতে হবে। মিডিয়ার মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। পুরুষ সহকর্মীদেরকে তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে এবং সহযোগীতার হাত বাড়াতে হবে। সমাজের মধ্যে আনুপাতিক হারে সমতা তৈরি হওয়া পর্যন্ত আমাদের তা করতে হবে। নারী সাংবাদিকদের আনুপাতিক হারে নিয়োগ ও তাদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষতঃ মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার বা রাষ্ট্রকেই মূল ভুমিকা রাখতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় তা দেখভাল করতে পারে। নিয়োগ পাওয়ার পরে সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষণের মধ্যে প্রফেশনাল এথিকস, কর্মস্থল সম্পর্কে, যৌন হয়রানীর নীতিমালা সম্পর্কে নারী-পুরুষ সবাইকে জানাতে হবে। মালিক, সম্পাদক, কর্মী সবাইকে নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। নারী সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর সহজাত কোন দুর্বলতা নেই। সময়, সুযোগ ও পরিবেশ পেলে নারী সবই করতে পারে। পৃথিবী সর্বোচ্চ পর্ব্বতমালা এভারেস্ট জয় করে নারীরা তা প্রমাণ করেছে। সবাই যদি নারী সাংবাদিকদের জন্য সংবেদনশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারি তবে, নারী সাংবাদিকরা যোগ্যতা বলে তার প্রতিভা ও মেধার সাক্ষর রাখতে পারবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে: আফজাল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *