মঙ্গলবার, জুন ২৭, ২০১৭
হোম > কর্মক্ষেত্রে প্রতিকূলতা > ঝরে যাওয়া সাংবাদিক ফারহানা খানম সুইটি

ঝরে যাওয়া সাংবাদিক ফারহানা খানম সুইটি

ছোটবেলা থেকেই যে কাজ করার জন্য তিনি দৃঢ় সংকল্প ছিলেন এবং কর্মক্ষেত্রের নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত সেই পেশায় তিনি টিকে থাকতে পারলেন না। ঠিক হতাশা কিংবা সামাজিক বাধা নয় কর্মস্থলের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং সেন্সরশীপের জন্যই তিনি পথ চলতে চলতে থেমে যান কিংবা ভিন্ন পথে পথ চলা শুরু করেন। সাংবাদিকতা পেশা থেকে এভাবেই ঝরে গেলেন একটি সম্ভাবনাময়ী নাম ফারহানা খানম সুইটি।

সুইটি কুষ্টিয়ার মেয়ে। সেখানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং কাজ করেছেন। ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৯৮ সালে একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা আন্দোলনের বাজার-এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি ২০০৯ পর্যন্ত কাজ করেন। পাশাপাশি প্রথম আলোর প্রদায়ক (কন্ট্রিবিউটর) হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেন। এছাড়া সাপ্তাহিক প্রোব-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এক বছর কাজ করেছেন। ২০০৭ সালে একুশে টেলিভিশন দ্বিতীয়বার সম্প্রচার শুরু করলে সুইটি সেখানেও প্রায় দেড় বছর  জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।

তিনি শুধু এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন এমন নয়, তার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন। ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে শিশু ভ্যান চালকদের নিয়ে প্রথম আলোর আলোকিত দক্ষিণে তার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র উদ্যোগী হয়ে ঐসব অসহায় ও শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের  নিয়ে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। এতে শিক্ষার পাশাপাশি শিশুরা আর্থিকভাবেও উপকৃত হয়। এভাবে সুইটি ঐ সময় আলোকিত দক্ষিণে বেশ কিছু প্রতিবেদন করেন, যা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সুইটির এরকম কিছু উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থবির হয়ে যাওয়া উন্নয়নমূলক কাজের উপর প্রতিবেদনটিও অন্যতম। এটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদসহ বেশ কিছু স্থাপনা মেরামতের কাজ করতে বাধ্য হন প্রশাসন। কুষ্টিয়ায় হরিজন সম্প্রদায়ের সন্তানরা প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেতেন না। এছাড়াও সমাজে তাদের নানা বাধা ছিল। এসব সমস্যা নিয়ে সুইটির বেশ কিছু প্রতিবেদন স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে ঐ সম্প্রদায়ের বিষয়ে মানুষ সচেতন হন এবং তাদের নানা সমস্যা দূর হয়। ফেয়ার নামে একটি স্থানীয় এনজিও হরিজন সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

২০০৯ সালে সুইটি আর্টিকেল ১৯-এর ফেলোশিপ পান। এতে তার বিষয় ছিল ধানের চাতালে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য। এ বিষয়ে আন্দোলনের বাজার পত্রিকায় তার প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি আলোচিত হয়। ফলে মালিকরা ঐসব শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হন।
এত অর্জনের পরেও সুইটি দীর্ঘ ১২ বছরের সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে বর্তমানে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। কেন সাংবাদিকতা ছাড়লেন জানতে চাইলে তিনি বলেন,“সাংবাদিকতা নারীর জন্য খুবই কঠিন কাজ। বিশেষ করে জেলা শহরে বা মফস্বলে নারীদের সাংবাদিকতা করার  ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রতিকূলতা রয়েছে। এসব শহরের প্রতিটি স্তরে নানা বাধার জাল বিস্তার করে আছে। এরপরেও আমি আমার স্বামীর উতসাহ, সহযোগিতা এবং স্থানীয় কিছু পুরুষ  সাংবাদিক ভাইয়ের সহযোগিতায় প্রায় এক যুগের মত এ পেশায় কাজ করেছি। কিন্ত শেষের দিকে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।”

ঐ সময় সুইটি কুষ্টিয়ায় একমাত্র নারী সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন। একসময়  সাংবাদিকতা পেশা  চলমান রাখা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। কেননা শেষের দিকে তিনি একুশে টেলিভিশনে কাজ করার সময় মফস্বল সম্পাদক কর্তৃক নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হন।  একুশে টেলিভিশন কুষ্টিয়া জেলায় আরও একজন পুরুষ প্রতিনিধিকে নিয়োগ দেয় এবং তার প্রেরিত সংবাদ সম্প্রচারের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়ায় সুইটির প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে সুইটি মফস্বল সম্পাদকের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি নানা ধরণের সমস্যার কথা বলেন এবং তাকে কুতসিত ইঙ্গিত দেন।

তিনি আরো বলেন, “জনৈক পুরুষ সাংবাদিক প্রতি মাসে ঢাকা এসে আমার সাথে দেখা করেন। যা আপনি করেন না।”  সুইটি বলেন, “তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সহযোগিতার পরিবর্তে লিঙ্গ বৈষম্য এবং অশালীন আচরণের শিকার হয়েছেন।” তিনি আরো বলেন, “প্রযুক্তিগতভাবে নারী সাংবাদিকদের দক্ষতার অভাব রয়েছে এবং পুরুষ সাংবাদিকদের দমনীয় মনোভাব সংবাদ সংগ্রহের কাজে বাধা সৃষ্টি করে।” তাই সবদিক ভেবে তিনি সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হন।

নারীদের সাংবাদিকতা পেশায় থাকতে হলে কী করা উচিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঢাকার পাশাপাশি মফস্বলের নারী সাংবাদিকদের প্রযুক্তিগতভাবে প্রশিক্ষিত হতে হবে। এছাড়া মিডিয়া হাউসের কর্তা ব্যক্তি ও নীতি নির্ধারকগণকে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে নারী সাংবাদিকদের জন্য কর্ম পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এর পাশাপাশি তারা যাতে সংবাদ সংগ্রহ বা প্রতিবেদন প্রকাশের পর কোনো ধরনের অসদাচরণ বা শারীরিক নিগ্রহের শিকার না হন সেদিকেও বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।”

সাংবাদিকতা পেশায় পুনরায় ফিরে আসবেন কিনা জানতে চাইলে সুইটি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “সুযোগ পেলে অবশ্যই আবারো সাংবাদিকতা পেশায় ফিরব। কেননা, এ পেশায় থাকা অবস্থায় আমার প্রতিটি অর্জন আমাকে এখনো আপ্লুত করে এবং বেশ টানে।”

শেষ পর্যন্ত সুইটি সাংবাদিকতা পেশায় ফেরার সুযোগ পাবেন কিনা জানিনা। তবে তার মত এরকম আরো কত নারী সাংবাদিক বৈষম্যের শিকার হয়ে সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে অন্য পেশা কিংবা ঘর সংসারে নিজেকে আবদ্ধ করেছেন বা চিরতরে ঝরে গেছেন তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এখনো সময় আছে এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার এবং এর প্রতিবন্ধকতাগুলোকে প্রতিরোধ করার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *