রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > অধিকার লঙ্ঘন > ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল বিড়ম্বনা ও প্রতিকার

ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল বিড়ম্বনা ও প্রতিকার

আজকের দিনে জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজ ও পেশা প্রযুক্তি নির্ভর। নারীরাও সমান তালে এ প্রযুক্তি নির্ভর জীবনযাপনে এগিয়ে যাচ্ছে, অবদান রাখছে জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে। তবে তাদের এ জীবন চলার পথ কন্টকমুক্ত নয়। ইন্টারনেটের এ যুগে নারীরা একদিকে যেমন ক্ষমতায়িত হচ্ছেন অন্যদিকে, অনলাইনে তারা নানান ধরনের হয়রানি, আক্রমণ ও সহিংসতার ঝুঁকি মোকাবেলা করে চলছেন। ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীরা বেশী হয়রানির শিকার হচ্ছে। তারা যে শুধু অপরিচিতদের মাধ্যমে অনলাইন হয়রানির শিকার হয় তা নয়, কর্মক্ষেত্রে তারা তাদের সহকর্মী ও বন্ধুর মাধ্যমেও হয়রানির শিকার হচ্ছে। অর্থাৎ ঘরে-বাইরে নারীরা নিরাপদ নন।

এ প্রসঙ্গে একজন অনলাইন মিডিয়াকর্মী তাসমি আনোয়ার তার নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, কোনো পুরুষ সহকর্মী বন্ধুত্বের প্রস্তাব দিল, কিন্তু সেটা গ্রহণ না করা হলে পরে তাকে ফেসবুেক নানা ধরণের অশ্লীল মন্তব্য করাসহ নানানভাবে হয়রানি হতে হয়। উল্লেখযোগ্য, স্কুল কলেজের কিশোরীরা এ ধরণের সহিংসতার শিকার বেশী হয় কারণ তারা ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা অনেক সময় ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে কখনও কখনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের গোপন ছবি বন্ধুর সাথে শেয়ার করে। পরবর্তীতে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক খারাপ হলে ঐ ছবি ব্যবহার করে হয়রানি বা হুমকি দেওয়া হয়। এ ধরনের প্রতিশোধ পরায়ণতা আজকাল ডিজিটাল হয়রানির ক্ষেত্রে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ডিজিটাল রাইটস্ ইস্যুতে আর্টিকেল 19 বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল বিভিন্ন ধরনের কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায়, এই বছরের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো আর্টিকেল 19 আয়োজিত দু’দিনব্যাপী সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকর্মীদের পেশাগত ঝুঁকি প্রশমন বিষয়ক প্রশিক্ষণ- সুরক্ষা; যেখানে সাংবাদিকদের ডিজিটাল সুরক্ষা বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ডিজিটাল সুরক্ষার আওতাভুক্ত বিষয়সমূহ ছিলো–ভাইরাস আক্রমন, হ্যাকিং, ডকুমেন্ট হারানো, অনলাইন হয়রানি, ডিজিটাল আইন ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার ও চর্চার ক্ষেত্রে সচেতনতা ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ আলোচনা।

ডিজিটাল হয়রানি বন্ধে সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু এসব চেষ্টা তেমন ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সম্প্রতি ফেসবুকে ভুয়া এ্যাকাউন্ট বন্ধে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, সৌদিআরবসহ কয়েকটি দেশ শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। এছাড়াও সরকার গত বছর সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ফেসবুকে কি করতে পারবেন আর কি করতে পারবেন না সে বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করেছেন। সে নির্দেশনা মেনে চললে দেশে সাইবার হয়রানি নিয়ন্ত্রণ আরও সহজতর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পাশাপাশি গত ২৮ মার্চ বাংলাদেশ সরকার ‘সাইবার থ্রেট ডিটেকশন এ্যান্ড রেসপনস্’ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দেশে সাইবার অপরাধ বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজতর হবে ।

এছাড়াও নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবেলায় ২০১১ সালে বাংলাদেশ পুলিশ কর্তৃক ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার চালু করাসহ তদন্ত ইউনিট খোলা হয়েছে। এই ইউনিটের অর্জনসমূহ হলো–নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক প্রায় ৪০০ টা কেস তদন্ত করা, প্রায় ১৭০০ ভিক্টিমকে সহায়তা দেওয়া, কুইক রেসপন্স টিমের মাধ্যমে ৭ জনকে সহিংসতার হাত থেকে উদ্ধার করা ইত্যাদি। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয় কর্তৃক নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে– লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারসহ সারা দেশব্যাপী ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল চালু করা, জাতীয় হেল্পলাইন সেন্টার খোলা ইত্যাদি। বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর হেল্পলাইন হচ্ছে ১০৯, যে নম্বরে ফোন করে দিনরাত ২৪ ঘন্টা বিনামূল্যে নারী ও শিশু বিষয়ক সহিংসতার ব্যাপারে যে কেউ দেশের যেকোনো স্থান থেকে সেবা গ্রহণ করতে পারবে।

দেশের সংবিধানের ৩৯ ও ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (২০০৬) এর ৫৭, ৫৪, ৬১ ও ৭৬ ধারাসমূহ বিশেষভাবে ৫৭ ধারা সেক্ষেত্রে স্ববিরোধী ও অস্পষ্ট। যা মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদন্ডের পরিপন্থীও বটে। ৫৭ ধারার শব্দসমূহ যেমন: মিথ্যা ও অশ্লীল, নীতিভ্রষ্টতা, মানহানি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি ইত্যাদি ব্যবহার করে এ বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় কমপক্ষে ২০ টি মামলা করা হয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে ভেটিং পর্যায়ে আছে ‘ডিজিটাল সুরক্ষা আইন’ নামে নতুন একটা আইন; ধারণা করা হচ্ছে এর মাধ্যমে আইসিটি এ্যাক্ট এর সকল অস্পষ্টতা দূর হয়ে যাবে। তবে প্রস্তাবিত আইনের খসড়াটিও সমালোচনার বাইরে নয়।

সাইবার অপরাধের ব্যাপ্তি আজ বিশ্ব বিস্তৃত সমস্যা। সম্প্রতি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের শিশু ও নারী উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী মানেকা গান্ধী সেদেশের স্বরাষ্ট্র, রেলওয়ে, ক্রীড়া মন্ত্রনালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কর্মক্ষেত্রে নারীদের অনলাইন সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন। বাংলাদেশেও এধরণের ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ, আইনের অস্পষ্টতা দূরীকরণসহ আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাংলাদেশে ডিজিটাল বিড়ম্বনা দূরীকরণে সহায়ক হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *