সোমবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৭
হোম > সফল কাহিনী > দেশকে এগিয়ে নিতে সৎ, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিকল্প নেই! – শাপলা রহমান

দেশকে এগিয়ে নিতে সৎ, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিকল্প নেই! – শাপলা রহমান

শাপলা রহমানের জন্ম ২০শে নভেম্বর। বাবা ফরাজী লুতফর রহমান এবং মাতা মমতাজ বেগম। শাপলা রহমান কাজ করছেন মূলত: মানবাধিকার, শিশু অধিকার, প্রেস ফিডম, নারী অধিকার নিয়ে। তিনি জার্মানে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামের সভায় যোগ দেয়া ছাড়াও ভারতসহ বাংলাদেশের বেশ কিছু ওয়ার্কশপে যোগ দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি গ্রামের কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

তিনি ইন্টারন্যাশনাল ওমেন মিডিয়া ফাউন্ডেশন (আই ডব্লিউ এম এফ), যশোর প্রেসক্লাব, সহ-সাধারণ সম্পাদক, যশোর ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্ট ও বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরামের সদস্য।

এবারের কন্যা সাহসিনীর সফল নারীতে আমরা কথা বলব শাপলা রহমানের সঙ্গে।

কন্যা সাহসিনী: আপনি কীভাবে সাংবাদিকতা পেশায় এলেন? কে বা কারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?

শাপলা রহমান:  ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহ ছিল প্রচুর। স্কুলে পড়ার সময় ফিচার, কবিতা, ছড়া লিখতাম। না বুঝেই যা ইচ্ছে লিখতাম। ইত্তেফাক, ইনকিলাব, সংবাদসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের শিশু বিভাগে লেখা ছাপা হত। সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ জন্মে ঠিক তখন খেকেই। পরে অনার্স তৃতীয় বর্ষে যখন পড়ি সে সময় দৈনিক গ্রামের কাগজ দফতরে আসা যাওয়া শুরু করি। সাংবাদিকতায় আসার পেছনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন আমার বাবা ফারাজী লুতফর রহমান আর আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ মাসুদুর রহমান কাজল। যাদের হাত ধরে এ পেশার সাথে আমার পরিচয়।

কন্যা সাহসিনী: আপনি যখন এ পেশায় আসেন  তখন নারী রিপোর্টার/সাংবাদিকদের  অবস্থা কেমন ছিল?

শাপলা রহমান: আমি ২০০৫ থেকে এ পেশায় আছি । লেখালেখি শুরু যদিও এর আগে থেকে। ভখনই দেখেছি যশোরে নারী সাংবাদিক মাত্র দু’জন। একজন এটিএন বাংলায় নাম শাহানারা বেগম আরেকজন হলেন রেবা রহমান, তিনি দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার যশোর অফিসের দায়িত্বে। মঠে কাজ করার মত কেউ নেই। একাই ছিলাম। দেশের অন্যান্য জেলা গুলোর অবস্থা তথৈবচ। সাংবাদিকতা যে পেশা এবং মেয়েরা এ পেশায় আসতে পারে তা অনেকের কাছে জানা ছিল না। আবার অনেক পরিবার জানলেও মেয়েরা এ পেশায় আসুক চাননি এবং এখনও চান না। আমি আসার পর অনেক মেয়ে এ পেশায় এসেছে। কেউ টিকে আছে কেউ পারেনি।

কন্যা সাহসিনী: এমন কোন ঘটনা কি আছে যার কারণে আপনি রিপোর্ট করেছেন এবং তার জন্য আপনি পরিবার বা নিজে হুমকির মুখে পড়েছেন? এই বিষয়গুলোর মোকাবেলা কিভাবে করেছেন? কারা কারা সহযোগিতা করছে?

শাপলা রহমান: উল্লেখযোগ্য ঘটনার একটি হল মুফতি হান্নান তখনও গ্রেফতার হয়নি। তার শ্যালিকা যশোরের এক মহিলা মাদ্রাসার দায়িত্বে ছিলেন। আমার কাছে তথ্য আসে ঐ মাদ্রাসায় পড়ালেখার আড়ালে জঙ্গি প্রশিক্ষণ চলে। আমি একদিন আমার এক বান্ধবীকে নিয়ে গেলাম ঐ মাদ্রাসায়। আমি গেলাম এক ছাত্রীর আত্মীয় হয়ে। সে মেয়েটি অসুস্থ ছিল আর তাকে রাখা হয়েছিল কাঠের তক্তার উপর। সেখানে না ছিল কোন বালিশ, না ছিল কোন চাদর। আলো বাতাস ঢুকতে পারে না। কোন বৈদ্যুতিক আলোও সেখানে ছিল না। অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। মাথার উপর দড়ি টাঙানো। সেখানে মেয়েদের ব্যবহৃত কাপড়, ন্যাপকিনের পরিবর্তে ব্যবহৃত নোংরা ন্যাকড়া সব ঝুলছে। এর মধ্যে মাদ্রাসার ছাত্রীদের বসবাস, থাকা, ক্লাস সবকিছু। গরমেও তাদের হাত ও পায়ে মোজা পরতে হয়। ৫ থেকে শুরু করে ১৫ সবাইকে কঠোর পর্দা করতে হয়।

কেঁচো খুড়তে কেউটে বের হওয়ার মতন অবস্থা। ওই মেয়েরাই বলল সেখানে কিছু ভাইয়ারা আর ওস্তাদজী লাঠি ও অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেয়। মেয়েদের ও শিখতে হয় এসব। পাশে দেখলাম বড় বড় বাঁশের লাঠি অনেকগুলো গাট্টি বাঁধা। আমার কাছে ক্যামেরা ছিল কিছু ছবি ও আমি তুলি যেগুলো পরে পত্রিকায় ছাপা হয়। তবে সেদিন আমাকে ওরা অবরুদ্ধ করে রাখে। আমি বুঝতেও পারিনি। আমি অফিসকে জানিয়ে এসেছিলাম বলেই রক্ষে। দেরি দেখে অফিস থেকে মাদ্রাসায় ফোন দেয় এবং অফিসে যেতে বলে। এক মহিলা টিচার আমার সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে- পরে জানতে পারি তিনি মুফতি হান্নানের শ্যালিকা। হান্নানের চ্যালাদের একটি ট্রেনিং সেন্টার ছিল ওটা।

সব কাজই সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করতে হয়। এ সময় আমার পরিবার, আমার অফিস থেকে আমাকে সাপোর্ট দেয়। পত্রিকার সম্পাদক পাশে ছিলেন।

কন্যা সাহসিনী: বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের সংখ্যা অনেক কম, এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

শাপলা রহমান: এর কারণ হল অবমূল্যায়ন। মেয়েদের যে মেধা আছে তারাও যে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারে তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেনে নেয় না। আর আমাদের মেয়েদের সমস্যা হল আসরা ভয়েস রেইজ করতে জানিনা। এ পেশায় বেশি বেশি নারী এলে মনে হয় উত্তরণ সম্ভব হবে।

কন্যা সাহসিনী: নারী সাংবাদিকদের এ চ্যালেঞ্জিং পেশায় এগিয়ে চলার পথে আপনি কীভাবে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করবেন? আপনার পরামর্শ কি?

শাপলা রহমান: আমি আমার জায়গা থেকে বলতে পারি চ্যালেঞ্জিং পেশা হিসেবে অন্যান্য পেশার মত মেয়েদের সাংবাদিকতাকে নিতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে সৎ,বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিকল্প নেই। তাই এ মহান পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ জরুরী। আমি যদি ভাল রিপোর্ট করে সবার প্রশংসা পাই আইডল হতে পারি তবে আমাকে দেখে সমাজে অনেক মেয়ে এ পেশাকে গ্রহণ করবে।

কন্যা সাহসিনী: আমাদের সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

শাপলা রহমান: কন্যা সাহসিনীর টিমকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *