সোমবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৭
হোম > সম্পাদকীয় > নারী ও নারী সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও শঙ্কামুক্ত অনলাইন ক্ষেত্র চাই

নারী ও নারী সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও শঙ্কামুক্ত অনলাইন ক্ষেত্র চাই

বর্তমান সময়ে আমাদের ব্যাক্তিগত ও কর্মজীবন তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছে এবং তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ প্রায় সমান তালে অভ্যস্থ । তবে এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে প্রায়শই নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মূখীন হতে হয়। বিশেষ করে নারীরা অধিক হারে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি মোকাবেলা করে থাকেন। কিন্তু তারপরও নারীরা থেমে নেই। সকল ধরণের লিঙ্গভিত্তিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা সাংবাদিকতার বিভিন্ন মাধ্যমে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তবে, অনলাইন ক্ষেত্র ব্যবহারে নারীরা অধিকতর ঝুঁকিতে থাকেন। প্রায়শই তাদেরকে অচেনা মানুষজন কিংবা কখনও কখনও সহকর্মীদের দ্বারা নানা ধরনের হয়রানি ,এমনকি মাঝে মাঝে সহিংসতার শিকার পর্যন্ত হতে হয়। অনলাইনের এ ধরনের অপরাধ বরাবরই কম আলোচিত এবং এর সুষ্ঠু প্রতিকার ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে নারীরা এবিষয়ে আইনের আশ্রয় নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। তাই, অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে নানা হয়রানি ও সহিংসতার বর্তমান অবস্থার পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষনের ভিত্তিতে আর্টিকেল 19 সময়োপযোগী এই বিষয়টিকে ফোকাস করে কন্যাসাহসিনীর এবারের সংখ্যাটি প্রকাশ করছে।

বাংলাদেশ ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। তবে দিনে দিনে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে হয়রানি এবং সহিংসতার মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জানা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৭৩ শতাংশ নারী নানা ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন এবং এর মধ্যে ২৩ শতাংশই অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকেন। দৈনিক সমকালের রিপোর্টার ও ব্লগার শামীমা মিতু, যিনি নিজের জীবন রক্ষা করতে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। নানান ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করার পরও সাংবাদিকতায় পিছিয়ে পড়েননি ফারজানা রূপা, নাদিয়া শারমিনসহ অন্যরা। রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত দেশের একমাত্র সাইবার ট্রাইবুনালে মামলার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ২০১৩ সালে মাত্র তিনটি মামলা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও বর্তমানে সেখানে ৩৮২ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

সাইবার হয়রানির ফলে নারীরা সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন। ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে কোথাও আজ নিরাপদ নয় নারীরা। বর্তমানে অনলাইন ক্ষেত্রকে যেভাবে সহিংসতা ছড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এতে করে নারী সাংবাদিকদের ঝরে পড়ার বিষয়টিকেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। সুতরাং নারী ও নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ডিজিটাল বিড়ম্বনা প্রতিরোধে অন্যান্য দেশের ন্যায় আমাদের দেশেও সময়োপযোগী ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজির ৫নং লক্ষ্য) জেন্ডার সমতা এবং নারী ও কন্যা সন্তানের ক্ষমতায়ন অর্জনে নারীদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী।

ইতোমধ্যে, আন্তর্জাতিক মহলে অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেয়ার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল একটি রেজাল্যুশন(সিদ্ধান্ত) গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের উপর যৌন ও লিঙ্গ বৈষম্যের সাথে সাথে তারা যে অনলাইনেও নানা ধরনের হয়রানি ও ভয়ভীতির শিকার হচ্ছেন সেই বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৩২/১৩ রেজাল্যুশনের প্রেক্ষিতে ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ক প্রতিবেদনের একটি খসড়া তৈরি করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার যেখানে অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ব্যাপারেও আলোকপাত করা হয়েছে। পাশাপাশি জতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য একজন বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে।

বর্তমানে অনলাইনে নারীরা যে হয়রানি কিংবা সহিংসতার শিকার হচ্ছে তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায়না। রাতারাতি এক্ষেত্রে বড় ধরণের পরিবর্তন আনাও সম্ভব না। তবে এসংক্রান্ত অপরাধ ও মামলার দ্রুত নিস্পত্তি উদ্যোগ নেয়া এবং বিদ্যমান আইনগুলোকে সময়োপযোগী ও সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নারী সাংবাদিক তথা নারীদের জন্য অনলাইন ক্ষেত্রটিকে আরও নিরাপদ ও শঙ্কামুক্ত করা যায়। অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে তা নিয়ন্ত্রণে সরকার ও মিডিয়া হাউজসহ সর্বোপরি সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

তাহমিনা রহমান
পরিচালক
আর্টিকেল ১৯,
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *