মঙ্গলবার, জুন ২৭, ২০১৭
হোম > সম্পাদকীয় > নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাই

নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাই

আজ বিশ্ব নারী দিবস। এই দিবসের মাহাত্ব্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আর্টিকেল ১৯ কন্যাসাহসিনীর এই সংখ্যাটি প্রকাশ করছে। এতে আমরা ফোকাস করছি নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার উপর। কেন এই ফোকাস? কারণ অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন ধরনের বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয় আর নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলো আরো বেশি প্রকট, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় প্রায়সময়ই। আমরা দেখতে পেয়েছি, নারী সাংবাদিক হত্যার শিকার পর্যন্ত হয়েছেন। আবার শুধু নারী হওয়ার কারণে আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতিতও হয়েছেন। আর অশ্লীল গালি-গালাজ, চরিত্রে কালিমা লেপন তো প্রতিদিনকার ঘটনা। অথচ সেক্টরটির অধিকতর নাজুক পরিস্থিতির মোকাবেলা করা এই নারী সাংবাদিকদের নিয়ে তেমন একটা উচ্চ-বাচ্য পরিলক্ষিত হয় না।

জ্বালানি বিটের নামকরা রিপোর্টার মেহেরুন রুনি তার সাংবাদিক স্বামী সাগর সারওয়ারসহ নিজ বাসায় নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন ২০১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। এই হত্যার ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মূল হোতারা এখনো অধরা। এই হত্যা মামলার তদন্তভার পাল্টেছে তিনবার। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে সময় দেয়া হয়েছে ৪৬ বার। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। সন্দেহভাজনেই ঘোরপাক খাচ্ছে তদন্ত। এই প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করা যায়, পাহাড়ের সাহসী মুখ ও অন্যায়ের প্রতিবাদকারী চট্টগ্রাম হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা অপহরণের ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা হয়নি।

অথচ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির নজির আমাদের সামনেই আছে। আছে শিশু রাজন হত্যা রায়ের নজিরও। আমাদের আহ্বান, অতি দ্রুত সাংবাদিক মেহেরুন রুনি ও সাগর সারওয়ারের হত্যার তদন্ত শেষ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। এই বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন হলে নারী সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

আমরা দেখেছি, সাংবাদিকতার কারণে ২০১৫ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ফারজানা রুপাকে পরিবারসহ হত্যার হুমকি দেয়। ২০১৪ সালে সাজেদা সুইটি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের নির্যাতনের কারণে নাদিরা শারমিনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। তাই নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে উদ্দ্যোগী হতে হবে।। আর সংশ্লিষ্ট মিডিয়া হাউজগুলোকেও নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্বে সাথে নিতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো, পুরুষশাসিত এ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো দরকার। এ সমাজকে হতে হবে মানুষশাসিত সমাজ।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে সকল রাষ্ট্র একটি সুদূরপ্রসারী রেজাল্যুশন (সিদ্ধান্ত) গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে, এই রেজাল্যুশনে নারী সাংবাদিকদের উপর যৌন ও লিঙ্গ বৈষম্যসহ বিভিন্ন ধরনের আক্রমণের নিন্দা জানানো হয়েছে। নারী সাংবাদিকরা যে একই সাথে সাইবার জগতেও ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেই বিষয়টিও এখানে উঠে এসেছে। এতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রসমূহকে জেন্ডার-সেনসিটিভ পদক্ষেপ নেয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে মানবাধিকার কাউন্সিল। তাই সকল সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া এবং বাক-স্বাধীনতার পথে প্রতিবন্ধকগুলোকে দূর করার জন্য সরকার, মিডিয়া হাউজ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানাচ্ছি।

 

তাহমিনা রহমান
পরিচালক
আর্টিকেল ১৯,
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *