শুক্রবার, আগস্ট ১৮, ২০১৭
হোম > প্রধান সংবাদ > পরিস্থিতি পর্যালোচনা: নারী সাংবাদিক নির্যাতন

পরিস্থিতি পর্যালোচনা: নারী সাংবাদিক নির্যাতন

সাংবাদিকতায় নারীর পদচারণা শুরু হয় বৃটিশ শাসনামলে। ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার একমাস আগে বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। এই সাময়িকীর সম্পাদক নুরজাহান বেগমের হাত ধরেই মূলত নারীরা সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করেন। আর ৬০’এর দশকে হাসিনা আশরাফ, নিশাত সাদানী, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সার্বক্ষণিক রিপোর্টিং পেশা বেছে নেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে নারী সাংবাদিকদের সংখ্যাও। কিন্তু নারী সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, সুরক্ষার ও স্বাধীনতা বাড়েনি। এ পেশার সূচনালগ্ন থেকেই নারী সাংবাদিকদের অপেক্ষাকৃত প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে বর্তমান প্রজন্মের ফারজানা রুপা, সাজেদা সুইটি, নাদিরা শারমিন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মেহেরুন রুনী কিংবা কল্পনা চাকমা হত্যার অগ্রগতি শ্লথ।

২০১৫ সালে আনসারউল্লাহ বাংলাটিম ফারজানা রুপাকে পরিবারসহ হত্যার হুমকি দেয়। ২০১৪ সালে সাজেদা সুইটি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৩ সালে হেফাজত কর্তৃক নারী সাংবাদিক নাদিরা শারমিন কে শারীরিক নির্যাতন করার ঘটনা ব্যাপক আলোচিত ছিল। ২০১২ সালে মেহেরুন রুনীর হত্যার ঘটনার কোন সুরাহা হয়নি। ১৯৯৬ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি কল্পনা চাকমা হত্যা, নাকি অপহরণ হয়েছেন। সেলিনা পারভীন বাংলাদেশের শহীদ নারী সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনী তাকে ঢাকার ১১৫ সার্কুলার রোডের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

দেশের বহুল আলোচিত নারী সাংবাদিক হত্যার মধ্যে মেহেরুন রুনি ও কল্পনা চাকমা হত্যাকান্ড উল্লেখযোগ্য। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ ফ্ল্যাটে এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়৷ এ ঘটনায় রুনীর ছোট ভাই নওশের আলম রোমান বাদি হয়ে শেরে বাংলানগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন৷ এ মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্ত চলছে। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের ১১ জুন মধ্যরাতে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাইল্যাঘোনার নিজ বাড়ি থেকে কল্পনা চাকমা নিখোজ হন। তিনি ছিলেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক। কল্পনা চাকমা হত্যাকান্ডের বিচারও ধীর গতিতে চলছে। পরিবারগুলো বারবার নারাজি পিটিশন দিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে।

আর্টিকেল ১৯-এর গবেষণায় দেখা যায়, নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং সেন্সরশীপের শিকার হয়। ৬৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রকাশে বাধার সন্মুখীন হন, ৪০ শতাংশ নারী সংবাদকর্মী যৌন নিপীড়নের শিকার হন। তারা নির্যাতনকারির বিরুদ্বে কোনো ধরণের প্রতিবাদ করেননি চাকুরি হারানোর ভয়ে। অন্যদিকে, ৪১ শতাংশ নারী সাংবাদিক রয়েছেন যারা বৈষম্যের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন; কিন্তু তারা কোনো ইতিবাচক ফলাফল পাননি।

নানামুখী বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও গণমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে এবং তারা পেশাগত দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। সাংবাদিকতায় নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। মুন্নী সাহা, সুমনা শারমিন, শাহানাজ মুন্নী, সামিয়া রহমান রোজিনা ইসলাম, ফারজানা রুপারা এর যথার্থ উদাহরণ। ফরিদা ইয়াসমিন প্রথম নারী যিনি জাতীয় প্রেসক্লাব নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। সাব-এডিটর কাউন্সিলের বর্তমান সভাপতি নাসিমা আক্তার সোমা। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ‘ডিক্যাব’সহ সাংবাদিক সংগঠনগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী নেতৃত্ব রয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে ও সাংবাদিকতায় নারীদের হার ছিল শতকরা ৭ শতাংশ। আশার কথা হলো নারী সাংবাদিকরা এখন সে অবস্থান থেকে এগিয়েছে অনেক দূর।

বাংলাদেশের সংবিধানে নারী অধিকারকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, একই সাথে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য বেশ কিছু আইন প্রণীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনগুলোতে সাক্ষর, অনুসাক্ষর করার ফলে সেসকল আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। নারী সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই এগিয়ে যেতে হচ্ছে।

সেলিম আকন
আফজাল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *