মঙ্গলবার, জুন ২৭, ২০১৭
হোম > গবেষণা > বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০১৫ উপলক্ষে আর্টিকেল ১৯ এর প্রতিবেদন প্রকাশ

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০১৫ উপলক্ষে আর্টিকেল ১৯ এর প্রতিবেদন প্রকাশ

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আর্টিকেল ১৯ ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ইন বাংলাদেশ-২০১৪’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক তাহমিনা রহমান। তিনি বলেন, এমন নির্যাতন সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য হুমকি।

 

সাংবাদিক সম্মেলনে আর্টিকেল ১৯, এর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া’র পরিচালক তাহমিনা রহমান আরো বলেন, “বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অযাচিত আক্রমণ, সহিংস ঘটনার বিচারিক তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য চরম বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে”।

 

তাহমিনা রহমান বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, “সাংবাদিকদের নিরপত্তার জন্য একটি কার্যকর সুরক্ষা কৌশল ও নীতিমালা প্রয়োজন”, যা গণমাধ্যমকর্মীসহ সকলের মুক্তচিন্তা প্রকাশে সহায়ক হবে। যেখানে একটি স্বাধীন কমিশন কাজ করবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতিসম্প্রতি নেপাল সরকার যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আমরা সেদিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি।

 

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অযাচিত আক্রমণ, তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে চরম বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আর্টিকেল ১৯, বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা ২০১৪ এর প্রতিবেদনে  বলা হয়েছে ২০১৪ সালে ২১৩ জন সাংবাদিক ও ৮ জন ব্লগার বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:

  • ৮ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন;
  • ৪০ জন গুরুতর জখম হয়েছেন;
  • ৬২ জনকে বিভিন্ন ধরণের শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে;
  • হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে ১০৬ ভাগ। ২০১৩ সালে ছিল ৩৩টি এবং ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮টি-তে;
  • ৮ জন ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্টসহ ১৭ জন গ্রেফতার হয়েছেন;
  • সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দসহ ১৩ জন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আদালত অবমাননার শিকার হয়েছেন;
  • অনলাইনে মতামত প্রকাশের বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে;
  • ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায় আটজন এখনো পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন;
  • নারী সাংবাদিকরা এখনো কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গগত হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যখন তারা বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন

 

প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎসগুলোর মাধ্যমে নির্যাতনের মাত্রা আশংকাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালের এই আক্রমণের মাত্রা ছিল শতকরা ৩৩.৬৯ ভাগ। ২০১৩ সালে ছিল ১২.৫ ভাগ। এর মধ্যে ২৩ ভাগ সংঘটিত হয়েছে পুলিশ, র‍্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। এছাড়া ১১ শতাংশ আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে আইনশৃংখলা বাহিনীর বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা। ৬৬.৩১ ভাগ  আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে। এর মধ্যে ৩৩.৬৯ ভাগ ঘটনা ঘটেছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে। যা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংস একটি ঘটনায়ও বিচারের মাধ্যমে কাউকে দোষি সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র পাঁচটি ঘটনার  তদন্ত শেষ  করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনা আইনের আওতার বাইরে রয়েছে।

 

প্রতিবেদনটির প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা গেছে শতকরা ৫৬.৫৫ ভাগ আক্রমণের ঘটনায় কোন আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অধিকাংশ ঘটনায় আক্রমণের শিকার সাংবাদিকবৃন্দ সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) পর্যন্ত করেননি। অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ঘটনার আক্রান্ত ব্যক্তিরা বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনী ব্যবস্থার নানা ফাঁক-ফোকর ও বিভিন্ন পর্যায় থেকে অসহযোগিতার কারণে আইনী পদক্ষেপ না নেওয়ার মূল কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এসব কারণগুলোকে হয়রানির মূল যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, (রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির  ইমেজ ক্ষুন্ন করা হয়েছে; অথবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত প্রদান করা হয়েছে, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায়) এই আইনে আসলে পরিস্কারভাবে কিছুই বলা হয়নি। এর ফলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এর  সুযোগ গ্রহণ করে। এটি একটি বড় সমস্যাসংকুল বিষয়।

 

প্রতিবেদনের  উপসংহারে  বলা  হয়েছে:

  • আক্রমণের প্রেক্ষিতে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা, তদন্তে দীঘসূত্রিতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাংবাদিকদের জন্য চরম বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
  • আইনের ফাঁক-ফোকর মতামত প্রকাশের জন্য ভয়-ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করেছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে (ব্লগার, অনলাইন এক্টিভিস্ট) আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বৃদ্ধি করছে। এ বিষয়টি অনলাইন সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেহেতু, বাংলাদেশে প্রচুর সংখ্যক অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।
  • বিচারহীনতার কারণে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎসগুলো, এমনকি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা অনেক সময় এসব সহিংসতা ও আক্রমণের ঘটনা সংঘটিত করে।

 

এ প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহিত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত  ‘কর্মপরিকল্পনা’য় বলা হয়েছে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত’ যা ‘ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিও’তে প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *