সোমবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৭
হোম > সফল কাহিনী > সবচেয়ে বড় কথা আমার সংকল্প ছিল, টিকে থাকার :: শাহনাজ মুন্নী

সবচেয়ে বড় কথা আমার সংকল্প ছিল, টিকে থাকার :: শাহনাজ মুন্নী

অনেকভাবেই তাকে পরিচিত করা যায়। সাংবাদিকতায় তার সাফল্যের ইতিহাসও অনেকখানি। তবে তার কর্মজীবনের শুরু থেকেই প্রস্ফুটিত হওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করার মত। বাবা-মা না চাইলেও ছোটবেলা থেকেই সাংবাদিকতায় তার দুর্বলতা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে পড়ার সময় থেকেই নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু। সেসব লেখা- খবরের কাগজ, প্রিয়জন এবং অনন্যায় প্রকাশিত হত। এমএ পাসের পর উবিনীগ-এর গবেষণা বিভাগে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে নজরুল ইন্সটিটিউট ও বাংলা একাডেমিতে কয়েকটি গবেষণা ফেলোশীপ করেন। গণ সাহায্য সংস্থার ‘প্রকৃতি’- পত্রিকায় সহযোগী সম্পাদক হিসেবে নারী নেত্রী মালেকা বেগমের সাথেও প্রায় দুই বছর কাজ করেন। ১৯৯৮-এ দৈনিক মানবজমিনে এক বছর কাজ করে ১৯৯৯-এ একুশে টেলিভিশনে যোগ দেন। ২০০৩ সালে এটিএন বাংলায় যোগ দেন। বর্তমানে সেখানেই নিউজ এডিটর হিসেবে কাজ করছেন। তিনি আমাদের সবার পরিচিত, প্রিয়মুখ শাহনাজ মুন্নী। আমাদের এবারের সফল কাহিনীতে তার জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন শানু মোস্তাফিজ।

কন্যা সাহসিনী: ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আপনি কাজ করছেন দীর্ঘদিন। বলা যায় আপনি সফল এবং একটা ভালো অবস্থানে এসেছেন। এই সাফল্যের কারণ কী?

শাহনাজ মুন্নী: আমি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কাজ করছি প্রায় ১৫ বছর ধরে। এর আগে কয়েক বছর আমি প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করেছি। আমার আজকের এই অবস্থানের পিছনে বলা যায় আমার পরিশ্রম, যোগ্যতা, সততা, দৃঢ় মনোবল এবং হাল ছেড়ে না দেওয়ার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ক. সা. সাংবাদিকতায় ভালো করার জন্য নিজেকে হয়ত সেভাবেই তৈরি করেছেন। হয়তো কিছু নিয়মও মেনে চলেন? কেমন ছিল সেসব প্রস্তুতি?

শা. মু. আগে থেকেই আমার লেখালেখির অভ্যাস থাকায় ভাষা ও বাক্য গঠনে আমার একটা দক্ষতা ছিল। একুশে টেলিভিশন দিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আমার সাংবাদিকতা শুরু হয়। ঐ সময় একুশে টেলিভিশনে বিবিসি থেকে একটি টিম এসে আমাদের দুই মাস ট্রেনিং দিয়েছিলেন। এরপর দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ হয়। এগুলো আমাকে সাংবাদিকতায় ভালো করার জন্য দারুণভাবে কাজে দিয়েছিল। তাছাড়া কাজ করতে করতেও অনেক কিছু শিখেছি। এখনো মনে হয়, প্রতিদিনই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নানা কিছু শিখছি।

ক.সা. এছাড়া নিশ্চয় মানসিক প্রস্তুতি তো ছিলই?

শা. মু. তাতো ছিলই। যখন আমি মনস্থির করেছি যে, সাংবাদিকতা করবো তখন নিজেকে সব ধরণের চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছি। এক্ষেত্রে উপস্থিত বুদ্ধি ও সহনশীলতা কাজে লাগিয়েছি। আমি আসলে কোনো সমস্যায় কখনো হটকারিভাবে প্রতিবাদ করেনি। বরং যৌক্তিকভাবে, শান্তভাবে, পরিস্থিতি বুঝে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি।

ক.সা. তাহলে কাজ করতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতা বা বাঁধার সন্মুখীনও হয়েছেন? সেগুলো কীভাবে মোকাবেলা করেছেন?

শা.মু. সাংবাদিকতায় কাজ করতে হলে কাজের চাপ বেশি থাকবে, এটা ন’টা পাঁচ’টার বাঁধা ধরা কাজ না- এটা জেনেই এ পেশায় এসেছি। তাই কখনো প্রতিবন্ধকতাকে প্রতিবন্ধকতা মনে করিনি। হালও ছাড়িনি। কিছু প্রতিকূলতা ও বাঁধা তো ছিলই। যেমন, আমরা যখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় রিপোর্টিং শুরু করি তখন খুব কম মেয়েই এ পেশায় ছিলেন। ফলে সামাজিকভাবে আমাদের গ্রহণ করারও একটা ব্যাপার ছিল। প্রথম দিকে মানুষ একটু অবাক হতো, কৌতুহলী হয়ে উঠতো, কিন্তু ধীরে ধীরে এসব সমস্যা কেটে গেছে। পরে সাধারণ মানুষের প্রচুর সহযোগিতা পেয়েছি, ভালবাসাও পেয়েছি। এ ছাড়া অন্যান্য ছোটখাটো সমস্যা মোকাবেলা করেই এ পেশায় টিকে আছি। তবে কখনো মনে হয়নি হাল ছেড়ে দেই। সবচেয়ে বড় কথা আমার সংকল্প ছিল, টিকে থাকার।

ক.সা. অন্য সমস্যাগুলো কী?

শা. মু. অন্য সমস্যাগুলো হলো প্রমোশন বৈষম্য, বেতন বৈষম্য, অ্যাসাইনমেন্ট দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য এ ধরণের কিছু সমস্যা। কর্মক্ষেত্রেও বার বার প্রমাণ দিতে হয়েছে, যে নারী হলেও আমি আমার পুরুষ সহকর্মীর চাইতে কোন অংশে কম নই। সমস্যাগুলো সব সময় শান্তভাবে মোকাবেলার চেষ্টা করেছি। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবাদও করেছি। তবে, রাতারাতি সব কিছু বদলানো যায় না। ধীরে ধীরে পাল্টায়।

ক. সা. এত কঠিন একটি পেশা? সময় বেশি দিতে হয়, বাড়ি ফিরতেও রাত হয়। তারপর রয়েছে পরিবার। কীভাবে এসব ম্যানেজ করেন?

শা. মু.  আসলে সবসময় নিয়মানুবর্তিতা এবং পরিকল্পনা করে চলাকে গুরুত্ব দিয়েছি। সন্তানদের হয়ত অনেক বেশি সময় দিতে পারিনি। কিন্তÍ যতটা দেওয়া দরকার ছিল, ততটা দিয়েছি। আমি বলতে চাই, তাদেরকে কোয়ান্টিটি টাইম দিতে না পারলেও কোয়ালিটি টাইম দিয়েছি। মাথায় ছিল, তাদের যে সময় দিব তা যেন কাজে লাগে। নিজে লেখালেখি করতাম সেসবের পিছনেও সময় দিয়েছি। কিছু সামাজিক কাজ করি সেগুলোতেও সময় দিয়েছি। আসলে সবকিছু একটা রুটিনের মত করে নিয়েছি। সেটা কোনো লিখিত রুটিন নয়, মাথায় সাজানো একটি বিষয়।

ক. সা. বিষয়গুলো কি পরিবার বুঝত? তারা কতটুকু সহায়তা করে?

শা. মু. পরিবার, সংসার, চাকুরি এসব ঠিক রাখতে প্রপার ম্যানেজমেন্ট দরকার। এক্ষেত্রে হয়তো বেশি টাকা দিয়ে ভালো গৃহকর্মী রাখতে হয়েছে। সেই গৃহকর্মীর সুখ-সুবিধা দেখতে হয়েছে। আমার শাশুড়িও আমাকে সাপোর্ট দিয়েছেন। সারাদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে গিয়ে হয়ত এমন কিছু দেখেছি যে কারণে মন খারাপ হয়েছে। কিন্তু সেসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাইনি। বাস্তবতার কারণে অনেক কিছু মেনে নিয়েছি। আমার স্বামী আমার ভাল বন্ধু, তিনি আমার পেশাকে মর্যাদা দেন, আমার কাজের প্রতি তার সন্মান আছে। আমাদের বোঝাপড়াটাও অনেক ভালো। ফলে তেমন সমস্যা হয় না।

ক. সা. আমাদের দেশের অনেক নারীই সাংবাদিকতায় আপনাকে আদর্শ মনে করেন। এ পেশায় তাদের এগিয়ে চলার পথে কীভাবে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করবেন?

শা. মু. আমি দশ বছর টানা রিপোর্টিং করেছি। এখন সম্পাদকীয় পদে কাজ করছি। যখন ফিল্ডে কাজ করতাম নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে ভালো লাগত। চিফ রিপোর্টারকে বলতাম, সব জায়গায় কাজ করতে চাই। নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে কখনো ভয় পাইনি। সততার সঙ্গে, মর্যাদার সঙ্গে কাজ করেছি। যে কোন পেশায় উন্নতি করতে হলে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলার কোন বিকল্প নেই। এটা ঠিক, অনেকে নারীর যোগ্যতার স্বীকৃতি দিতে চায় না, পদে পদে বাধা তৈরি করে, কিন্তু সেজন্য দমে গেলে চলবে না। এক সময় না এক সময় জয় আসবেই। তবে মনোবল হারালে চলবে না। মনোবল দৃঢ় রাখতে হবে। তাহলে কোনো বাধাই আর বাধা থাকবে না। পরিশ্রমকে ভয় পেলে চলবে না। কিছুতেই পিছিয়ে আসা যাবে না। আরেকটা জিনিস প্রয়োজন তাহলো- নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলা। ওটা না হলে কিছু হবে না। এটা নারীদের জন্য দুর্ভাগ্যই যে তাকে কাজ করে সবাইকে বুঝিয়ে দিতে হয় যে- ‘আমি’ও পারি’।

ক. সা. আপনি এখন নিউজ এডিটর হিসেবে কাজ করছেন। এ এক অন্য অভিজ্ঞতা। রিপোটিংকে কতটা মিস করেন এবং এখনকার অভিজ্ঞতা কেমন?

শা.মু. সময়ের প্রয়োজনেই এখন আমি নিউজ এডিটর হিসেবে কাজ করছি। এই জায়গায় এখনো কিন্তু নারীদের উপস্থিতি খুব কম। তাছাড়া অভিজ্ঞ লোকেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অনেক দুর্বলতা রয়েছে এখানে। আমার অফিস চাইছিল আমি সম্পাদনার বিষয়গুলো দেখি। পাশাপশি রিপোর্টিং করি। নিউজ এডিটরের দায়িত্ব হচ্ছে নিউজটা ঠিকভাবে চালানো। এতে পুরো বুলেটিনটা সম্বন্ধে ধারণা রাখতে হয়। নিউজরুমের বিভিন্ন বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রিপোর্টিং একটু মিস্ করলেও এ কাজটাকেও কিন্তু আমি উপভোগ করছি। এছাড়া এখানে কাজ করায় নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারছি। আমার কাছে আমার নারী সহকর্মীরা কোনো সমস্যার কথা বললে আমি সেসব কথা উপরের দিকে জানাতে পারছি। এভাবেই হয়ত তাদের জন্য কিছু করা সম্ভব হবে।

ক. সা. আপনার ভবিষ্যৎ ইচ্ছে কী?

শা. মু. আমি খুব বেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করিনি। ঘন ঘন চ্যানেল পরিবর্তন করিনি। আমার অন্য অনেক সহকর্মীর চাইতে আমার উপরের দিকে উঠার গতি ধীর। আসলে আমি স্ট্যাবলিটির দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এখন যে জায়গায় কাজ করছি এরপর প্রমোটেড হলে হয়ত আরেকটা বড় পদে যাবো। আমি ধাপে ধাপে এগুতে চাই।

তবে আপনাকে আমার একটা স্বপ্নের কথা বলতে পারি। সেটা হয়ত খুব সিলি শোনাবে। কিন্তু এটা আমি সত্যি করতে চাই। যদি কখনো কেউ ফাইন্যান্স করেন তাহলে আমি শুধু মেয়েদের নিয়ে একটি টিভি চ্যানেল করতে চাই। সেখানে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব জায়গায় শুধু মেয়েরাই কাজ করবে। এই স্বপ্নটা নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। হয়তো একদিন সত্য হলেও হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *