সোমবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৭
হোম > অধিকার লঙ্ঘন > হেফাজতের তেরো দফা এবং নারী সাংবাদিক

হেফাজতের তেরো দফা এবং নারী সাংবাদিক

যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্যান্য বিষয়ের মত বাংলাদেশেও ইদানিং নারী সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রের পরিধি বেড়েছে। এক সময় নারী, শিশু, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন সফট এ্যাসাইনমেন্ট-এর মধ্যে নারী রিপোর্টারদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকত। এখন অর্থনীতি, জ্বালানী, অপরাধ, ক্রীড়া, রাজনীতি এমনকি নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। বলা যায় অবশ্যই তারা প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। তবে সংখ্যা এখনও তেমন  সন্তোষজনক নয়।

কারণ, জ্বালানি বা ক্রীড়া বিটে যেখানে দশজন পুরুষ রিপোর্টার কাজ করছেন, সেখানে নারী রিপোর্টার মাত্র দুইজন। এরপরও আমরা আশান্বিত হচ্ছি, তারা এগিয়ে আসছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, সমাজ তাদের কীভাবে নিচ্ছে? অবশ্যই সমাজ তাদের গ্রহণ করছে। তা না হল এ তারা কীভাবে কাজ করছেন? কীভাবে তারা প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান হচ্ছেন? তাহল এ বলা যায়, সমাজও ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিতৃপ্তিতে আঘাত আসে, যখন দেখা যায় নারী সাংবাদিক তার দায়িত্ব পালনকাল এ ভায়োলেন্স বা হিংস্রতার শিকার হন। এই তো বিগত ২০১৩ সাল এর ৬ এপ্রিল ঢাকার মতিঝিল এর শাপলা চত্ত্বরের অদূরে পুরান পল্টনে একুশে টেলিভিশনের রিপোর্টার নাদিয়া শারমিনের উপর হেফাজতে ইসলামের সদস্যরা যেভাবে হামলা চালান তাতে শুধু নারী সাংবাদিক নয়, সকল সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। তবে নাদিয়া শারমিন আক্রান্ত হয়েছিলেন সাংবাদিক হিসেবে নয়, নারী হিসেবে।

চরম উগ্রপন্থি হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবিতে যখন পল্টনে সমাবেশ করার কর্মসূচি চালাচ্ছিলেন তখন অন্য এক সিনিয়র রিপোর্টারের পরিবর্তে নাদিয়া সাইড ফুটেজ আনার জন্য সেখানে যান। সেখানে সীমাহীন জনসমাবেশের মধ্যে ‘হঠাত নারী কেন’-এই  প্রশ্ন করে তার উপর আতর্কিত আক্রমণ চালায় হেফাজতে  ইসলামের কিছু সদস্য।  মহূর্তের মধ্যে তাদের সাথে যোগ দেন অন্যান্যরা। তারা নাদিয়াকে তাড়িয়ে নিয়ে যান বিজয়নগর পর্যন্ত। নাদিয়া সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করায় প্রায় ৭০ জন তার উপর চড়াও হয়ে তাকে মারপিট করে মাটিতে ফেল এ দেন। ঐ সময় বিজয় নগরে অবস্থিত দিগন্ত টেলিভিশনের সাংবাদিকরা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এরপর অন্যান্য সাংবাদিক এবং পুলিশ নাদিয়াকে হাসপাতাল এ নিয়ে যান। সেখানে তার দীর্ঘদিন চিকিতসা চলএ। তার পায়ে দুটি অপরেশন হয়।

শুধু নাদিয়া নয় ঐ দিন আরো তিনজন সাংবাদিককে তারা মৌখিকভাবে হেনেস্থা করে। এর মধ্যে ফিন্যান্সসিয়াল এক্সপ্রেস এর একজন নারী সাংবাদিকও ছিলেন। নাদিয়ার অপরাধ ছিল, তিনি নারী হয়ে কেন পুরুষ সমাবেশে গিয়েছেন। দেশ-বিদেশে এ ঘটনা নিয়ে তুমুল তোলপাড় হয়। পরের দিন বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র একটি মানববন্ধন করে। এতে যোগ দেয় বিএফএইজের একটি অংশের সভাপতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং মানুষের জন্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এরপর বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবি সমিতি, বিএফইউজে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগসহ (নাদিয়া এই বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী) ৩০টি সংগঠন এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। সবচেয়ে হতাশার কথা, এরপরেও ঐসব কাপুরুষ হেফাজতে ইসলামের একজন সদস্য গ্রেফতার হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়। কিন্ত সে মামলা দেশের আর দশটি মামলার মতোই এখন পর্যন্ত  নিস্ক্রিয়।

Nadia-Sharmin-bangla-news

নাদিয়ার উপর আক্রমণ শুধু নারী সাংবাদিক বা সাংবাদিকের উপর আক্রমণ নয়, এটি আমাদের সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছদেরও পরিপন্থি। এ বিষয়ে নাদিয়া শারমিন আর্টিকেল ১৯- কে বলেন, “একজন নারী সাংবাদিকের সাথে হেফাজতে ইসলামের আচরণই বল এ দেয় বাংলাদেশে নারীদের সাথে তাদের আচরণ কী হবে? আর এ আচরণকে যদি তারা নিজেদের দায় বলএ মেনে না নেন, তবে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি সমাবেশে যেখানে একজন নারী সাংবাদিককে তারা নিরাপত্তা দিতে পারেন না, সেখানে সারাদেশে নারীদের নিরাপত্তা তারা কোথা থেকে দেবেন? এর উপর তাদের তেতুল তত্ত্ব আর ফুল তত্ত্ব তো আছেই।”

তিনি আরো বলেন, “নারী নীতির সম্পত্তি সংক্রান্ত অধিকার নিয়ে তাদের দু:শ্চিন্তা ছাড়া তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট সমস্যা তারা চিহ্নিত করতে পারেননি। অথচ নারী নীতি অনাদিকাল থেকেই তাদের অপ্রিয়। তেতুল তত্ত্বের অডিওতে অবশ্য এর কারণ কিছুটা বোঝা যায়। শিক্ষায় নারীরা যখন উত্তরোত্তর উন্নতি করছে তখন দেশের কিছু মানুষ বেগম রোকেয়ার যুগে ফিরে গিয়ে আবার নারী শিক্ষার অধিকার থাকবে কিনা তা নিয়ে চিন্তা শুরু করেছেন। এটা কতটা হাস্যকর তা বোধহয় তাদের বোঝানো যাবে না।”

নারীরা কর্মক্ষেত্রে আসার সাথে সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরের প্রাণই তো এখন নারী। এ অবস্থায় এ সেক্টরের নারীদের কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানে তারা সাহায্য না করে তাদের রোজগাররের পথ বন্ধ করতে উতসাহী হয়ে উঠেছেন। কট্টর মুসলিম দেশ আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানের মত বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। এর স্বাধীনতার মূলমন্ত্রই ব্যক্তি ও ধর্মের স্বাধীনতাকে ঘিরে আবর্তিত। সংবিধানেও সেই সুর ধ্বনিত হয়।

ধর্মের অবমাননা রোধে বর্তমান যে আইন আছে তা নিয়ে তেমন কাউকে মামলা করতে দেখা যায় না। অথচ নতুন আইনের দাবিতে অস্থির হেফাজতরা। মূলত ইসলামি সমাজব্যবস্থা যারা সত্যিকার অর্থেই কায়েম করতে চান তাদের এ ধরণের ১৩ কিংবা ১৪ দফা নয়, আসল এ এক দফা থাকে। তা হল কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী সমাজব্যবস্থা। যেখানে সংবিধান হবে কুরআন। সম্পূর্ণ ধর্মীয় রীতিতে যদি সমাজ চালাতে হয় তবে গণতন্ত্র বা অন্য কোনো মানুষের লেখা সংবিধান তাদের মানার কথা নয়। কাজেই তাদের পক্ষেই সম্ভব এভাবে নারীর সাথে এ ধরণের অশালীন ব্যবহার এবং অসভ্যতা করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *