মঙ্গলবার, জুন ২৭, ২০১৭
হোম > গবেষণা > ২৭ জন নারী সাংবাদিক নির্যাতিত হন ২০১৩ সাল এ

২৭ জন নারী সাংবাদিক নির্যাতিত হন ২০১৩ সাল এ

আর্টিকেল ১৯- এর বাক স্বাধীনতা বিষয়ে বাতসরিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৩ সাল এ ৪ জন সাংবাদিক এবং ১ জন অনলাইন এ্যাকটিভিস্টকে হত্যা করা হয়। এছাড়া ৭৮ জন শারীরিকভাবে আহত, ৮৯ জন লাঞ্চিত এবং ১৩ জন গ্রেফতার হন। এর মধ্যে ৬ জন অনলাইন একটিভিস্ট ছিলেন। ১২ জন সাংবাদিককে হেনস্থা করা হয় মিথ্যা মামলা দিয়ে, ২২ জনের দায়িত্ব পালন অবস্থায় সম্পদ এবং যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হয়। প্রতিবেদনে আরো দেখা যায় যে, ২৭ জন নারী সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন।

এসব নির্যাতনের মধ্যে নাদিয়া শারমিনের ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। যিনি হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের নিউজ কভার করতে গিয়ে সমাবেশকারীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন।  জাকিয়া আহমেদ ও মাশরেকা মোনা এরাও নির্যাতনের শিকার হন দায়িত্ব পালনের সময়। প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৭টি নির্যাতনের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, যৌন নিপীড়ন, অশ্লিল বাক্য প্রয়োগ এবং পেশা থেকে দূরে চলে যাওয়ার জন্য জোরাজুরিও উল্লেখযোগ্য।

২০১২ সাল এর প্রতিবেদনে ৫৫টি কেস পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেশিরভাগই লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতন। আর্টিকেল ১৯ মূলত সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করে এবং তারা সবসময় এই কাজে নারী  সাংবাদিকদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। এ সূত্রে নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব অন্যায় ও নির্যাতন হচ্ছে তার প্রতিকার করার জন্য আর্টিকেল ১৯ Righting Wrongs against Women Journalist প্রকল্পটি  শুরু করেছে।  বিগত ৪/৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে  এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প। এতে যে কার্যক্রম রয়েছে তা হলো- বিভিন্ন নির্যাতনের প্রতিবাদ করা, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করা এবং মনিটরিং করা।

নারীর প্রতি বৈষম্যের একটি বড় কারণ নারী সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা পেশা থেকে ঝরে যাওয়া। বিভিন্ন কারণের ভিত্তিতে এই বৈষম্য হয়ে থাকে। যেমন- বয়স, বেতন, বৈবাহিক কারণ ইত্যাদি। এই বৈষম্যের শিকার হয়ে তারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে অপহরণ, হুমকি-ধামকি, সম্পদ ধংস ইত্যাদি।

আর্টিকেল ১৯-এর গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, নারী সাংবাদিকরা যতগুল নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার মধ্যে ৪১ শতাংশ নির্যাতনের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়েছে, কিন্তুু কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। ৬০ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনায় কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সেন্সরশীপ এবং বৈষম্য বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা, ডকুমেন্টশন, নীতিমালা পর্যবেক্ষণ এবং ৫৫টি কেসস্টাডির বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় যে, মিডিয়াতে নারীরা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং সেন্সরশীপের শিকার হচ্ছেন।

আরো বিস্তারিতভাবে বললে বলা যায়-

Untitled

সংবাদ মাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ: বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের নিচে। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ হার ৩৮ শতাংশ। কিছু ইতিবাচক উদাহরণ থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের হার খুবই সীমিত। সম্পাদনা এবং ব্যবস্থাপনায় মাত্র ০.৬ শতাংশ নারী রয়েছেন।

সেন্সরশীপ এবং বৈষম্য: সাংবাদিকদের নিয়ে আমাদের  যে নেটওয়ার্ক, তাতে নারী সাংবাদিকদের বাক স্বাধীনতার অধিকার লংঘন, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং সেন্সরশীপ রয়েছে। এতে বিভিন্ন কেস ডকুমেন্টেড এবং প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সাল এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ৫৫টি কেস ডকুমেন্টেড করা হয়।

ক. সেন্সরশীপ-এর মূল ক্যাটাগরিগুলোর মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্য, যৌন নিপীড়ন অন্যতম। এর অন্যান্য ধরণগুলোর মধ্যে রয়েছে  হুমকি, অপহরণ, প্রতিবেদন করতে বাধা প্রদান, শারীরিক নির্যাতন এবং সম্পদ বিনষ্ট করা।

খ. ৫৫টি কেসের মধ্যে শতকরা ৬০ শতাংশ কেসে প্রতিত্তোরকারীরা অভিযোগ করেছেন, তারা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যর শিকার হন। শতকরা ৫২.৭০ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হন এবং ৪৭.৩০ শতাংশ অন্যান্য সেন্সরশীপ যেমন; প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা, সম্পদ ধংস, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ এবং হুমকির শিকার হন।

গ. লিঙ্গ বৈষম্যর ধরণগুলো হলো- সামাজিক এবং পেশাগত গ্রহণযোগ্যতার সীমাবদ্ধতা, গতানুগতিক লৈঙ্গিক ধ্যানধারনা, বেতন এবং বয়সের ক্ষেত্রে বৈষম্য, সুযোগ-সুবিধা এবং ছুটির ক্ষেত্রে বৈষম্য, পরিবারের সহযোগীতার অভাব এবং চুক্তিপত্র না দেওয়া।

ঘ. শতকরা ৬৬ শতাংশের মতো প্রতিত্তোরকারী বলেন, তারা কেবলমাত্র মৌখিক চুক্তি অনযায়ী কাজ করছেন।

ঙ. দেশের অধিকাংশ এলাকায় নারীকে সাংবাদিক হিসেবে মেনে নেওয়ার মনোভাবের অভাব রয়েছে। প্রতিনিয়ত তারা তথাকথিত গতানুগতিক ধ্যানধারণার নারীকে দেখতে চান। নারী সাংবাদিকরা তাদের কাছে অতিরিক্ত স্মার্ট এবং রাতের শিফট কিংবা অপরাধ বিষয়ক খবর সংগ্রহের যোগ্যতা নেই বলে উল্লেখ করেন।

চ. বৈষম্যর বিষয়ে গতানুগতিক জেন্ডার ধ্যান ধারণার আরো যেসব অভিযোগ পাওয়া যায় সেগুলো হলো; নেতিবাচক মন্তব্য, তাদের কাজের প্রতি নেতিবাচক আচরণ এবং তাদের কাজের দক্ষতা নিয়ে উপহাস করা। যেমন; নারী সাংবাদিকরা অপরাধ, আদালত, রাজনৈতিক এবং সংবেদনশীল খবর সংগ্রহে অপারগ।

ছ. নারীরা বেতনের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হন। যেমন; পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় নারী সাংবাদিকদের অনিয়মিত বেতন প্রদান করা হয়। এছাড়া কম বেতন, বেতন দিতে অস্বীকৃতি এবং চাকুরি থেকে অব্যাহতি নিলে সুবিধাসমুহ দিতে অস্বীকৃতি জানান মিডিয়া হাউসগুলো।

জ. শতকরা ৬৩.৬ শতাংশ প্রতিত্তোরকারী প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পান। কিন্ত তাদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ নেন তথ্য মন্ত্রণালয় কিংবা অন্যান্য এনজিও থেকে।

ঝ. লিঙ্গভিত্তিক সুনির্দিষ্ট সেন্সরশীপ হল জনসম্মুখে অসম্মানজনক শব্দ প্রয়োগ। নারী সাংবাদিকদের চরিত্র নিয়ে সমালোচনা ও কটুক্তি করা, শারীরিক আঘাতের হুমকি এবং যৌন নিপীড়ন। এগুলো মূলত একজন নারীর কথা বলাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ঞ. বহুল ব্যবহৃত যৌন নির্যাতন হলো যৌনতা সুলভ আচরণ, কুরুচিপূর্ণ আলোচনা এবং ভয় দেখানো। যেমন বলা হয়-  তোমাকে আজ সুন্দর দেখা যাচ্ছে, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না ইত্যাদি।

সেন্সরশীপের অন্যান্য ধরণসমুহ: প্রায় শতকরা ৬৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক তাদের প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রকাশে বাধার সন্মুখীন হন।

সাংবাদিক কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমুহ: শতকরা ৪০ শতাংশ নারী সংবাদ কর্মী, যারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তারা অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরণের প্রতিবাদ করেননি চাকুরি হারানোর ভয়ে।

অভিযোগের ফলাফল: শতকরা ৪১ শতাংশ নারী সাংবাদিক রয়েছেন যারা বৈষম্যের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন তারা কোনো ইতিবাচক ফলাফল পাননি, বরং সেই বৈষম্যমূলক কাজের পরিবেশের মধ্যে তারা কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। ক্ষমা প্রদর্শনকে সন্তোষজনক সমাধান হিসেবে ধরা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *